‘ভাব’ এক অর্থে সাধারণত ‘দর্শন’ বলতে আমরা যা বুঝি তা-ই। কিন্তু বাংলার ‘ভাব’-কে আমরা পাশ্চাত্য বা ভারতীয় ‘দর্শন’ থেকে দার্শনিক কারণেই পৃথক বলে বিচার করি। দর্শন অর্থ দেখা। দার্শনিক অর্থে এই দেখার অর্থ সত্য দর্শন করা, প্রমাণ করা বা দেখানো। দর্শনে সত্যের যে-ধারণা তার সঙ্গে দেখাদেখির, নিজে দেখা বা অন্যকে দেখানোর ব্যাপারটাকে অভিন্নই ধরে নেওয়া হয়। আমাদের দাবি বাংলার ‘ভাব’ সত্যকে ঠিক এইভাবে দেখে না। সম্ভবত এর সঙ্গে বাংলার তন্ত্রের একটা সম্পর্ক আছে যেখানে দেহ শুধু চোখ বা দৃষ্টি নয়, পঞ্চইন্দ্রিয়মাত্রাও নয় বরং ব্রহ্মাণ্ডের শরীরের সঙ্গে দেহ অভিন্ন। দেহ ছাড়া চিন্তা বলে আলাদা কিছু নাই। দেহ যদি ব্রহ্মাণ্ডই হয় তাহলে রক্তমাংসের মানুষরূপে চিন্তা যখন চিন্তা করে তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিজেই নিজেকে নিয়ে ভাবে—এই অনুমান আমরা বাংলার ভাবান্দোলনে প্রায়ই দেখতে পাই।
বাংলার ভাবান্দোলনকে শুধু ভাব, দর্শন বা জ্ঞানের জায়গা থেকে বিচার করলে চলবে না। তার রাজনীতি বা রাজনৈতিকতার বিচারও চাই। বাংলার ভাবান্দোলন সম্পর্কে আমাদের আগ্রহের এটাই প্রধান দিক। শুধু ‘ভাব’ হিশাবে বিচারের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। বিপ্লবী রাজনীতি—অর্থাৎ বিদ্যমান ব্যবস্থার খোলনলচে পালটে দেবার যে-রাজনীতি বাংলার ভাষায় ও ভাবে, সেই বৈপ্লবিকতার আবাহন করবার তাগিদেই বাংলার ভাবান্দোলনে আমরা আগ্রহী হয়েছি।
বিশ্বব্যবস্থার বদল ঘটাবার জন্য যাঁরা ভাবে ও তৎপরতায় সক্রিয়, তাঁরাই বাংলার ভাবান্দোলনের সত্যিকারের ছাত্র—আশা করি অন্যরাও একই অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত হবেন।
“ভাবান্দোলন” কেবল একটি বই নয়; বরং ভাষা, মানুষ এবং ‘হওয়া’-র প্রশ্নকে নতুন করে ভাবার আহ্বান। এই গ্রন্থে ফরহাদ মজহার দেখাতে চেয়েছেন—বাংলার ‘ভাব’ কোনো আবেগের নাম নয়; ‘ভাব’ মানুষের হয়ে ওঠার ভাষা, সম্পর্কের অভিজ্ঞতা, এবং ইতিহাসকে ভেতর থেকে অনুভব করার এক বিশেষ সাধনা।
নতুন সংস্করণের ভূমিকায় ফরহাদ মজহার ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কিভাবে বাংলার ভাবচর্চা নানান ধারা ও স্রোত গ্রিক দর্শন, আরবি ফালাসাফা এবং ইসলামি ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে। বাংলার ভাবচর্চা একটি মৌলিক দাবি উত্থাপন করে: জ্ঞান কেবল ধারণার বিষয় নয়; জ্ঞান দেহ, ধ্বনি, কাব্য ও সমবেত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও গড়ে ওঠে। মানুষের জীবন, প্রেম, সমাজ এবং দিব্য উপলব্ধি জাগতিক সম্পর্ককে এমনভাবে ধারণ করে যা প্রচলিত দর্শনের ভাষায় ধরা যায় না। বুদ্ধি বা যুক্তি আমাদের বিভিন্ন বৃত্তির একটি মাত্র। বাংলা বুদ্ধির দাসত্ব থেকে বের হয়ে এসে নিজেকে কিভাবে সকল বৃত্তিসহ উপলব্ধি করে এবং দিব্যতার সাক্ষী হয়—এই গ্রন্থ তারই অন্বেষণ।
এই গ্রন্থের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন সহজ কিন্তু গভীর: মানুষ কি শুধু জানে, নাকি মানুষ হয়ে ওঠে ও হয়? যদি হওয়াই মুখ্য হয়, তবে তার ভাষা কেমন? “ভাবান্দোলন” সেই ভাষার সন্ধান।
যাঁরা ভাষা, দর্শন, ইসলামি চিন্তা, এবং বাংলার সাধনা ঐতিহ্যকে নতুন চোখে দেখতে চান—তাদের জন্য এই বই এক অনিবার্য পাঠ।
top of page
৯০০.০০৳ Regular Price
৬৭৫.০০৳Sale Price
Socials
Related Books
bottom of page

















